CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘হাজার চুরাশির মা’ কিংবা ‘অরণ্যের অধিকার’—বাংলা সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবী এক স্পর্ধিত কলমের নাম, যা আজীবন কথা বলেছে শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে। ২০২৬ সাল এই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের জন্মশতবর্ষ। সেই শতবর্ষকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে গত ৫ই মার্চ উত্তর কলকাতার ‘আয়না ঘর’ মঞ্চে এক বলিষ্ঠ নাট্য-প্রতিবাদ তুলে ধরল কলকাতার নাট্যদল ‘রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ’। উপলক্ষ ছিল দলের ১৭ বছরে পদার্পণ ও প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন। এই মাহেন্দ্রক্ষণেই মঞ্চস্থ হলো মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী ছোটগল্প অবলম্বনে নতুন প্রযোজনা ‘বাঁয়েন’।
রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে তাঁদের প্রযোজনার মধ্য দিয়ে সমাজের অবদমিত কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে প্রয়াসী। ‘বাঁয়েন’ নাটকের মাধ্যমে সেই ধারাটি আরও সংহত হলো। ড. দানী কর্মকারের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় এই নাটকটি বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও সমাজের গভীরে প্রোথিত নৃশংস কুসংস্কারের এক ভয়াবহ চিত্রকে নগ্ন করে দেয়। এক দুগ্ধবতী মা চণ্ডী দাসীকে কীভাবে ‘ডাইনি’ বা ‘বাঁয়েন’ অপবাদ দিয়ে সমাজচ্যুত করা হয় এবং তাকে একা ফেলে রাখা হয় লোকালয়ের বাইরে—সেই নির্মম আখ্যানই নাটকের মূল উপজীব্য।
নাটকের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা যায়, চণ্ডী নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে হাজার হাজার ট্রেনযাত্রীকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। তাঁর এই বিরল সাহসিকতার পর সমাজ যখন তাঁকে মরণোত্তর ‘রুপোর মেডেল’ দিয়ে সম্মানিত করতে চায়, তখনই নাটকটি এক তীব্র সামাজিক সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। চণ্ডীর পুত্র ভগীরথ তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে— "মাগো, এই রুপোর মেডেল তোমাকে বাঁয়েন থেকে মানুষ করে দিল।" এই একটি সংলাপ দর্শকাসনকে স্তব্ধ করে দেয়। ভগীরথের এই ঘোষণা যেন আমাদের ভণ্ড ও নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থার গালে এক সজোর চপেটাঘাত। একজন মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য কেন একটি পদকের প্রয়োজন হবে, সেই নৈতিক প্রশ্নটিই মঞ্চে বড় হয়ে ওঠে।
নাটকটির আলোকসম্পাত, আবহ, মঞ্চ ভাবনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ড. দানী কর্মকার। অভিনয় কুশলতায় বর্ণালী কর্মকার, শুভায়ন রায়, সুমনা ঘোষ, রাজদীপ সাহা, বিনায়ক কর্মকার ও রিকিতা শর্মা এক নিটোল পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। পুরো আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সীমা কর্মকার। দর্শক সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও, প্রতিটি দৃশ্য শেষে প্রেক্ষাগৃহ মুখরিত হয়েছে দর্শকদের অকুণ্ঠ করতালিতে।
নাটক শেষে দলের ১৭তম জন্মদিন পালনের পাশাপাশি এক বিশেষ মাইলফলক স্পর্শ করা হয়। গত ১৩ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক দ্বিভাষিক নাট্য গবেষণা পত্রিকা ‘থিয়েটার দুনিয়া’-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এদিন। ২০১৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় দেশ-বিদেশের বহু নাট্যবিদ ও গবেষক কলম ধরেছেন। মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষে তাঁরই সৃষ্টিকে পাথেয় করে রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধের এই সৃজনশীল লড়াই আগামী দিনে নাট্যচর্চার পথকে আরও গবেষণাধর্মী ও গণমুখী করবে বলেই মনে করছেন উপস্থিত নাট্যজনেরা।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142