CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি হালিশহর ইউনিটি মালঞ্চের বিনোদিনী মঞ্চে, কাঁচরাপাড়া ফিনিকের মিলন সাংস্কৃতিক উৎসবে অভিনীত হয়েছিল রাধানগর দর্পণ কালচারাল অর্গানাইজেশনের নাটক "চক্ষুদান"। এই নাটক ২০০৯ সাল থেকে ক্রম-মঞ্চায়নে প্রায় ৮০০-এর কাছাকাছি অভিনীত হয়ে গেছে। নাটকের রচনা সৌমিত্র বসু। সম্পাদনা গার্গী দত্ত। সামগ্রিক পরিকল্পনা, আবহ নির্মাণ ও নির্দেশনা কিশোর মৈত্র। আবহ প্রক্ষেপণ করেছেন অমৃতা সরকার। মঞ্চভাবনা ও সজ্জা অভিজিৎ সরকার এবং বিশ্বনাথ মজুমদার। আলো অভিজিৎ দাস। রূপসজ্জা বিশ্বনাথ মজুমদার। সব দিক ব্যালেন্সড এই নাটকের নির্দেশক কিশোর মৈত্র। তিনি অনুপম দক্ষতায় পাত্র-পাত্রীদের অভিনয় প্রকরণ ও মঞ্চ-আলো-আবহকে সুষম বিন্যাসে সাজিয়েছেন।
মফস্বল বাংলা নাটকের দরবারে প্রায় ২০০০ সালের গোড়া থেকেই বিশিষ্ট চমক হয়ে এই রাধানগর দর্পণ কালচারাল অর্গানাইজেশনের আবির্ভাব ঘটেছিল। কারণ তৎকালীন সময়ের প্রতিযোগিতার আসরে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলের ধারাবাহিক নাট্যচর্চার ধারার মধ্যেই এই দল নিজেদের অস্তিত্বকে রীতিমতো লড়াই করেই দাঁড় করিয়েছিল। অনেকগুলি ভালো প্রযোজনার মধ্যেই এই 'চক্ষুদান' দুর্দান্ত উপস্থাপনা হয়েছিল। গার্গী দত্তের নিজের অভিনয় দক্ষতার চূড়ান্ত রূপ উঠে এসেছে এই নাটকে। আটের দশক থেকে সকল স্বনামধন্য অভিনেত্রীদের মধ্যেই গার্গী দত্ত একেবারেই বাচিকে, শারীরিক বিভঙ্গে, নিজেকে ভাঙচুর করে এই চক্ষুদান নাটকের ঠাকুমা চরিত্রে এনেছেন। ভার্সেটাইল অভিনেতাদের যে গুণ থাকা উচিত, তা ওনার মধ্যে রয়েছে। সংলাপে ওনার পাশে অভিনয় সবাই করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ বছর আটেক আগে বহরমপুরে এবং এদিন আবার এই নাটক দেখে মনে হয়েছে, লিখিত সংলাপের উপর ভিত্তি করে তিনি এই অপরূপ চরিত্রটি নির্মাণ করেননি। করেছেন ইম্প্রোভাইজেশনে নিজের ঐকান্তিক অনুভব-অনুভূতির দাসত্ব করে। তিনি টেনশন ও রিলাক্সেশনের দক্ষ কারিগর। কাজেই ওনার উপমা উনি নিজেই। শ্রদ্ধেয় গৌতম মুখোপাধ্যায় এইভাবেই বহু নাটকে সাবলীল-স্বাভাবিকভাবে না অভিনয় করেই প্রখ্যাত হয়েছিলেন। কাজেই গার্গী দত্ত সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা যেতে পারে। সে অর্থে, এই চক্ষুদান নাটকের সামগ্রিক মঞ্চ, আলো, আবহ এবং স্কুলিং অফ অ্যাক্টিং ও প্রসেসিং অফ থিয়েটার দুর্দান্ত।
এই নাটকে দেশমাতৃকার প্রতীক হয়ে ঠাকুমা এসেছেন। যিনি একসময়ে বনেদি যৌথ পরিবারের এক রমণীয় রমণী ছিলেন। তাঁর কাছের মানুষ আজ নেই। বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এক নাতি অনেক দিন পরে এসেছে। ঠাকুমাকে ভালোবাসে সে। তাই চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবার অছিলায় চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। এরপর বাড়ি বয়ে আসা চোখের ডাক্তার, অন্ধত্বের অন্ধকারে ধীরে ধীরে বাড়ির প্রাচীন সম্পদ সংগ্রহ করে নিয়ে পালাতে থাকে। বোঝা যায় কৌশল আর দেশের বিরুদ্ধে বিদেশি হস্তক্ষেপ। তাই হাসি-মজা-ফ্যান্টাসির মধ্যেই চাপা পড়ে আছে এক গূঢ় রাজনৈতিক সত্য। সময়ের জন্য কিছু দেখানো এক বীভৎস লুটপাট এই নাটকের ভেতরের সত্যি। কিন্তু গার্গী দত্ত যে প্রখর চারিত্রিক বিন্যাস করেছেন, যত মজা এবং সুনিপুণ আনন্দিত আভাস নাটকের মজাদার বাতাস, তাতে এই নাটকের বক্তব্য কিছুটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। দর্শকেরা মশগুল হয়ে ঠাকুমার কাণ্ডকারখানা দেখে যেভাবে হাসির রোলে ফেটে পড়ে, তাতে বিষয় কী, তা ক'জন ভেবেছেন, এখানে সংশয় আছে।
তথাপি একটি মিষ্টি এবং উপভোগ্য নাটক হিসেবে অভিনন্দিত উপস্থাপনা। তেমন উল্লেখযোগ্য বোধোদয় না ঘটিয়েও, প্রতীকী স্তরে আসল সংবাদ লুকিয়ে রেখে এই প্রযোজনা সার্থক। কারণ রমেন লাহিড়ীর 'রাজযোটক' একটা ভুলে-বেভুলে জ্ঞানের বিস্তারের আদি নাটক হিসেবে স্বীকৃত। সৌমিত্র বসুর লেখা নাটকই, গার্গী দত্তের সম্পাদনা ও সেই মোতাবেক অভিনয়ে মঞ্চনাটকের মহাজ্ঞানী প্রযোজনা হয়ে ওঠে। বিভিন্ন চরিত্রে, যেমন নাতি / কিশোর মৈত্র, ডাক্তার / বিশ্বনাথ মজুমদার, বিচারক / কিরীটী মৈত্র, উকিল / সুজিত দাস এবং বার ড্যান্সার / অমৃতা সরকার, সকলেই এই নাটকে অনবদ্য উপস্থিতিতে আছেন। তবে গার্গী দত্তের তুখোড় খেলা (play), যেভাবে মঞ্চে ছক্কা পিটিয়ে চলে, তার কাছে দু-এক রান নেওয়া দৌড় নজরে তেমন দানা বাঁধে না। তবুও এগিয়ে চলুক এই চক্ষুদান পর্ব, মানুষের রাজনৈতিক মতবাদের প্রতিষ্ঠায়।
বিশেষ সংবাদ: জানানো দরকার, গার্গী দত্ত এক বছর সাত দিন পরে এদিনই অভিনয় করলেন। একটি কঠিন অসুখে উনি বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। বহু নাট্যকর্মী-নাট্যজন ওনাকে খোঁজখবরে রেখে এইভাবে আবার মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছেন। অনেকের শুভেচ্ছা আর শুভকামনা এই মর্মে কাজ করেছে। বিশেষভাবে ফিনিক নির্দেশক কনক মুখোপাধ্যায় এদিন ওনাকে আবার মঞ্চে আনার কৃতিত্ব পেতে পারেন। এই গুরুত্বেই ফিনিক অভিনয়ের একইসাথে এদিন ওনাকে কাবেরী মুখার্জী স্মৃতি সম্মাননা জ্ঞাপন করেছিল। একরকম মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরে, আবেগাপ্লুত চোখের জলে ভেসেই গার্গী দত্ত দর্শকদের অনেক আন্তরিক কথাও ব্যক্ত করেছিলেন। আমরাও ঋদ্ধ হয়েছি ওনাকে মুখোমুখি পেয়ে।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142