CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: রানাঘাট 'সৃজক' সংস্থা “চড়ুইভাতি” নাটক মঞ্চস্থ করার আগে কিছু বার্তা জানায়, যা হলো— আমেরিকা, ইসরায়েলসহ পৃথিবীজুড়ে সমস্ত যুদ্ধবাজ দেশগুলো ক্ষমতা দখল করে একছত্র রাজত্বের লড়াইয়ে পারস্পরিক বিবাদে পৃথিবীকে নিঃচিহ্ন করে দিতে চলেছে। তাদের হাতে আছে পারমাণবিক শক্তি। একটি গবেষণায় পাওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, পৃথিবীর আয়ু মাত্র ৮৫ সেকেন্ড!
আমেরিকা যদি এই মুহূর্তে 'ডুমসডে' মিসাইলের মাধ্যমে ইরানের মাটিতে একটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে, কিংবা ইরানও একই কাজ করে বসে, তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আমাদের হাতে করার আর কিছুই হয়তো থাকবে না... কারণ এই পারমাণবিক বোমা হিরোশিমা-নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত বোমার থেকেও ২০ গুণ শক্তিশালী। আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর আয়ু তখন হবে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড! তাই আমরা যারা শিল্পচর্চা করি, থিয়েটার করি—আমরা বোঝার চেষ্টা করি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়... তখনই আমাদের থিয়েটার, আমাদের শিল্পচর্চার অভিমুখ হয়ে যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে।"
মিউনাসের টানা ২৪ ঘণ্টার, জন্মশতবর্ষ স্মরণে “বাদল নাট্য উৎসবে” গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান জেলার পানাগড়ের সাতকাহনিয়ার তেপান্তর নাট্যগ্রামে, “এবং আমরা” ব্ল্যাক বক্সে অভিনীত হয়েছিল রানাঘাট সৃজক সংস্থার এই যুদ্ধবিরোধী প্রযোজনা “চড়ুইভাতি”। এখানে টানা যে ১৯টি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, তার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বটেই; কিন্তু এই একটি নাটক ছিল সময়ের জন্য চরমতম প্রাসঙ্গিক। কারণ ওইদিনই, বা এই নাটকের উৎসব চলার মধ্যেই ইরানের সাথে আমেরিকার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এইটুকু লিখেই আমি গর্বিত অনুভব করছি, কেননা রানাঘাট সৃজক নাটকে দেখিয়েছিল—মাথার ওপর দিয়ে বোমারু বিমান চলেছে, আর মানুষ যারা নাটকের চরিত্র, তারা মাঠের মধ্যে একটা শিশু/কিশোরের হাতে বন্দুক রেখে রেডিও বাজিয়ে গান শুনে মহানন্দে পিকনিক করছে।
এই নাটকটি প্রচলিতভাবে বাদল নাট্য সমগ্রে নেই। সৃজক নির্দেশক নিরুপম ভট্টাচার্য কীভাবে হাতফেরতাভাবে পেয়েছিলেন (তা গবেষণার বিষয়)। এই ছোট্ট একটি দল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে যারা ২০১০-১২ সাল থেকে রানাঘাটে সিরিয়াস নাট্যচর্চা চালাতে সচেষ্ট আছে, তারা অন্তত ভেবেছে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে তির্যক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের প্রহসন কিংবা উপহাসের উপহার নিয়ে যত্রতত্র গিয়ে ক্ষুদ্র সামর্থে অভিনয় করতে। যখন বাংলা নাটকের মঞ্চে আশু সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে ঘুরিয়ে কান দেখাবার রমরমা নাট্যায়ন ধুমধামে চলছে এবং তাতে যখন বিস্মিত হবার কোনো সংবাদ নেই, তখন সৃজক দলের সকলে এই যুদ্ধের সম্ভাব্যতা আগাম বুঝেছিলেন। যদিও বিবৃতিতে বলা হয়েছিল প্যালেস্টাইনের যুদ্ধের পরিস্থিতির কথা। সময়কে দেখে জীবনের শঙ্কায় সংস্থা যে মর্মে যন্ত্রণা দগ্ধ হয়েছিল, তাই ব্যক্ত করতে মঞ্চায়নে বদ্ধপরিকর হয়েছিল—বিভিন্ন মঞ্চে, মণ্ডপে, এমনকি ভূমিখণ্ডের ওপরেও যেকোনো সাধারণ আলোতে। কারণ নিজেরা খুব নামি-দামি না হয়েও বা গ্র্যান্ট-ভাতা ইত্যাদির দাসত্ব না করেই এই দল অঞ্চলের মানুষদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের নাটকের দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য মরিয়া হয়ে আছে। গাজায় একটি শিশুও বাঁচবে না—এমনই ঘোষণা আছে, অবস্থাও মারাত্মক। সারা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে মরণাপন্ন বাস্তবতা সবাইকে যেমনটা ভাবায়, সৃজকও এমন এক জ্বলন্ত সমস্যায় এই “চড়ুইভাতি” নাটক অকপটে অত্যন্ত স্বাভাবিক ছন্দে অভিনয় করে যেমন মিউনাসের উদ্যোগকে ধন্য করেছিল, তেমনই বিশিষ্ট এক দায়বদ্ধ নাটকের কাজ করে আমাদের ঋদ্ধিমান করেছে।
“চড়ুইভাতি” নাটকের মূল নাট্যকার ফের্নান্দো আররাবাল (Fernando Arrabal)। বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন বাদল সরকার, নামকরণও তাঁর। সৃজকের পক্ষে আবহ ও মঞ্চ ভাবনায় নির্বাণ ভট্টাচার্য, আবহ কারিগরি সহায়তায় লোকনাথ দাস, নাট্যকর্মশালা পরিচালক রজত দাস, সহকারী পরিচালক নির্বাণ ভট্টাচার্য এবং সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নিরুপম ভট্টাচার্য প্রমুখেরা সকলেই এই প্রযোজনার প্রাণ হয়ে আছেন। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঞ্জন মল্লিক, নিরুপম ভট্টাচার্য, মৌসুমী ভট্টাচার্য, বিকাশ ঘোষ, বিকি সামন্ত এবং রাহুল বিশ্বাস।
নাটকের মধ্যে পিকনিক ময়দানে যুদ্ধবাজ সেনারা ঢুকে পড়েছিল। জীবন-মৃত্যুর মধ্যেই মানুষ কত স্বচ্ছন্দ যাপনে হাসি-মশকরা করতে পারে, তা দেখিয়েই এই নাটক আমাদের নির্বিবাদী, নির্বিকার ও আপসপ্রবণ চরিত্রকে চিনিয়ে দিয়ে আমাদের সবার গালে কষিয়ে চড় মেরে জাগাতে চেয়েছিল। এ যাবৎ এই নাটকের অন্য কোথাও অভিনীত হবার খবর জানা নেই। নাটকের অনেক সংবাদ না জেনেই যেটুকু আলোচনার, তাতে সকল শিল্পী নিজেরা গ্রামীণ নাট্য সমাজ থেকে উঠে আসা মানুষ হয়েও সুন্দর। বাচ্চা ছেলেটি এবং তার মা এই নাটকের শক্তি। বাবা-মা ছেলের আত্মরক্ষায় চড়ুইভাতি করতে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে খাবার খেতে বসেছে—অসাধারণ মঞ্চ ভাবনা। অকারণ উত্তেজনা নাটকে নেই, সবই সাবলীল যাপনের তরঙ্গে ছিল। তার মধ্যে মঞ্চের ওপর একটা ঘড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রয়োগে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল না এমনও নয়। তবুও জরাজীর্ণ সমাজে এই শুধু বেঁচে থাকার মধ্যেই সত্যিকারের বাস্তব নাটক যে “চড়ুইভাতি”—এটা বর্তমানের হাহাকারে, পারস্পরিক কাড়াকাড়ি ও রাষ্ট্রনায়কদের সৃষ্টি করা সমস্যায় মানুষ কী করতে পারে, তা সৃজক দল ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে।
রানাঘাট সৃজক গত ডিসেম্বর মাস থেকে বাদল সরকারের নাটক “চড়ুইভাতি” মঞ্চস্থ করছে চলমান যুদ্ধের বিরোধিতার জন্য। যুদ্ধের বদলে চড়ুইভাতি করে চলাই জেগে থাকার নাটকে সামিল থাকা।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142