CALL FOR PAPERS - SEPTEMBER, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: ২রা এপ্রিল, “অশনি নাট্যম”-এর প্রতি মাসের নিয়মিত থিয়েটার পর্বে, হাজরার সুজাতা সদনে অভিনীত হয়েছিল বোড়াল পশ্চিম নিশ্চিন্তপুরের “অন্যমুখ” নাট্যদলের এক ঘণ্টা সময়ের মজাদার এবং বার্তাপূর্ণ নাটক “কালের কণ্ঠ”। রাষ্ট্রনির্ধারিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে তীর্যক নজরে দেখা এই নাটকটি মূলত একটি সুচারু মিউজিক্যাল উপস্থাপনা। এই প্রযোজনা সবদিক থেকেই উন্নত। চমৎকার কল্পিত ব্যঞ্জনার রূপায়ণ এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বার্তা দেওয়ার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা। নাট্য গঠনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “তোতাকাহিনী” গল্পের বীজ নিয়ে নাটকের সামগ্রিক শরীর গড়ে তোলা হয়েছে। নাটকের গল্প বলা ও প্রযোজনার এগিয়ে চলার সাথে সাযুজ্য রেখে বেশ কটি নতুন গানের ব্যবহার ছিল চমৎকার। সব চরিত্রের অভিনয় এবং মঞ্চ, আলো ও আবহ যথেষ্ট ভালো। তার সাথে খুঁটিনাটি মাত্রা মাথায় রেখে সব চরিত্রের পোশাক, মাথার মুকুট বা দড়ি ঝুলিয়ে চুলের কল্পনা ও কোরাসদের সাজসজ্জা ইত্যাদি সহ চরিত্রের মুখোশের বিচিত্র ব্যঞ্জনা অভিনব ছিল। এই নাটকে অনেক ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আনা হয়েছে। মোটকথা, নাট্যে যা কিছুই হয়েছে সবই অনুপম ছন্দে, তালে ও লয়ে বাঁধা; এক হারমোনিক ও অনুপম উপস্থাপনা। তাই নাটকটি যেমন নান্দনিক, তেমনই এই সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক উদাসীনতাকে কটাক্ষ করে গুরুত্বপূর্ণ চেতন-কথা বলেছে। বিচিত্র আস্বাদিত অলঙ্করণের সৃজনশীল প্রয়োগ অনবদ্যভাবে এই নাটককে মর্যাদাপূর্ণ করেছে।
এই নাটক লিখেছেন পলাশ বোস। নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নির্দেশনা কমল (বাবন) সেনগুপ্ত। সহ-নির্দেশনা সন্দীপ বোস। সঙ্গীত দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়। আলো সমীর সরকার। রূপসজ্জা গোঁসাই সাহা। লাইভ যন্ত্রানুসঙ্গে বিশ্বনাথ দে, বিশ্বজিৎ বৈদ্য এবং বিধান সমাদ্দার। শব্দ সংযোজন করেছেন বিকাশ। মঞ্চ ও পোশাক তারক দাস। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় জয়ন্ত ঘোষ মজুমদার।
এই নাটকে সূত্রধর বেশে আসা এক জোকার এবং অমানুষী (হিজড়া)র বিচিত্র কথনে অসীম সরকারের ভূমিকাটি উপস্থিত দর্শকদের খুব ভালো লেগেছিল। অবশ্যই কেউ-ই মন্দ নন, তবুও রাজা চরিত্রে সন্দীপ বোস দুর্দান্ত। তিনি সুন্দর গানও গেয়েছেন। স্বাভাবিক একটি স্ট্রেট লাইন চরিত্র হিসেবে মন্ত্রী চরিত্রে চঞ্চল সরকার নাটকে মানিয়ে গেছেন। তাপস ভট্টাচার্যের ভাগ্নে চরিত্রটি নাটকের দ্বন্দ্বকে তীক্ষ্ণ করেছে। সারাক্ষণ মঞ্চে বিবিধার্থ ব্যবহারের মধ্যে কল্যাণ দত্ত ও সুমনা পাইক ছিলেন অনবদ্য দুই ভূমিকায়। এই প্রহরী ১ এবং ২ ছাড়াও প্রহরী ৩ হয়ে করবী দত্ত শক্তিশালী ভূমিকায় ছিলেন। এছাড়া পুরোহিত সমীর চক্রবর্তী, চিত্ত সাহা এবং সুভাষ চক্রবর্তী নাটকের কার্যকরী ভূমিকায় ছিলেন। সবচেয়ে দুরন্ত ছিল তোতাপাখি। অঞ্জনা বিশ্বাস প্রচুর পরিশ্রম করে পাখির অন্তঃসত্তাকে উপস্থিত করেছেন; একটা বিহঙ্গী মনন নিজের দেহ-বিভঙ্গে ধরেছেন। কাজেই সব মিলিয়ে খুঁটিনাটি নিয়ে পরিপাটি করে গড়ে তোলা “কালের কণ্ঠ” বিনোদন এবং যন্ত্রণার বার্তা নিশ্চিতভাবেই দিয়ে যাবে। নাটকটি যত বেশি মঞ্চায়িত হবার সুযোগ পাবে, তত মানুষের কাছে পৌঁছাবে। অনেক সাধারণ নাটকের ভিড়ে বোড়াল পশ্চিম নিশ্চিন্তপুরের “অন্যমুখ” দল আমার কাছে বিশেষ নাট্যাভিনয় বলে অনুমিত হয়েছে। তাই এই নাটকের নির্দেশক ও উদ্ভাবক কমল সেনগুপ্তকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তিনি নিজে জয়পুরবাসী হয়েও যেভাবে দলটিকে চালনা করছেন, তার মধ্যেই তিনি যে একজন যথার্থ শিল্পী তার প্রমাণ রেখেছেন নাটকের প্রতিটি স্তরে। এই ধরনের নাটকের জন্য যে মুন্সীয়ানার প্রয়োজন হয়, সৃজনশীল সরবরাহের উজ্জ্বলতা দিয়ে প্রহসনের মাধ্যমে বক্তব্য বলার উপযুক্ত আঙ্গিক নির্বাচন এবং সবার জ্ঞান ও শিল্প উপলব্ধিকে ব্যতিক্রমী নাটকে নিয়োজিত করার সেই মুন্সীয়ানা প্রশংসনীয়। “কালের কণ্ঠ” নাটকটিকে একটি সম্মিলিত শিল্পে ও সমবেত নির্মিতিতে নিয়ে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা সার্থক। অপরিচিত এই দলের পরিচয়জ্ঞাপক এই প্রতিবেদন লেখার উদ্দেশ্য তাই— নাটকটি যেন আরও অভিনয়ের মাধ্যমে সকলের নজরে আসে।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142