CALL FOR PAPERS - SEPTEMBER, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: ২০২৫ সালে, গাজোল ‘বিষাণ একটি সংস্থা’র জাতীয় নাটকের উৎসবে ডিসেম্বর মাসে অভিনীত হয়েছিল সংস্থার সাম্প্রতিক নাটক ‘লজ্জা’। প্রায় একই সময়ে, কলকাতায় এই নাটকের দুটি আমন্ত্রিত অভিনয় হয়েছিল। গত ১৪ মে ‘বিষাণ একটি সংস্থা’র পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে সংস্থার নিজস্ব ৬টি সাম্প্রতিক প্রযোজনার মধ্যেই এই নাটকের আবারও মঞ্চায়ন হলো—বিষাণ অঙ্গন মঞ্চে, স্থানীয় এবং বাইরের আমন্ত্রিত দর্শক ও অতিথিদের সামনে।
আমাদের সামনে বিগত সময়ের ঘটনা, বা ক্রমেই ঘটে চলা রাজনৈতিক ব্যভিচারের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এই নাটকে উঠে এসেছে। যেখানে বাকরুদ্ধতা আর অত্যাচার সয়ে যাওয়ার নিদান আছে। যার মধ্যে প্রধান বিষয় শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের জীবন শুরু করতে না পারার দশা আর চাকরির প্রতি হাহাকার। আর তুলনায় প্রায় ঘুমিয়ে পড়া সময়ে বিপ্রতীপ আহ্লাদিত হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক বা গণমাধ্যমে তরুণদের প্রতিকারহীন বাস্তবতাকে দেখা, ক্রমেই দেখে চলা, আর পারস্পরিক আলাপন গড্ডালিকায় আত্মবীক্ষণকে ধামাচাপা দিয়ে, আত্মসুখে বিভোর থাকা অবস্থা। তবুও ক্রম ঘটনাপ্রবাহে প্রায় স্থবির এক শিল্পীর উঠে আসা অবিচলতার প্রজ্ঞা হয়েছিল, যে দেখেছে, দেখে গেছে পরিবেশ-প্রতিবেশের অসহায়তা। চূড়ান্তে যার কণ্ঠরোধ হয়েছিল অনিবার্য বাস্তবতায়। কারণ রাম শিক্ষিত বেকার হয়ে স্বাধীনভাবে চায়ের দোকান দিয়ে নিজের উপার্জনের লক্ষ্যে ব্যস্ত ছিল। সে নিজেকে নুইয়ে দিয়েই সময়ের স্বঘোষিত আর্তনাদ ভুলে বেঁচেবর্তে ছিল। একটা নিরুপায় লড়াইয়ে পেট-ভাতের সন্ধান মুখর করে রাখার রাজনৈতিক চালে আটকে গেছিল সে, যেভাবে চারিদিকে আরও সবাই আক্রান্ত হচ্ছে। এই নাটক এইসব দেখিয়ে বাংলার হতাশার বিরুদ্ধে একটা নীরব অক্ষম প্রতিবাদ করেছে। অনেকগুলিই টুকরো দৃশ্য দিয়ে এই নাটক শুধুই অবস্থাকে তুলে ধরেছে। আমাদের চলমান বঞ্চনার ব্যবস্থাকে দর্শিয়েছে। নির্বিকার ছিল দিন-প্রতিদিনের এই ক্লান্ত চলার প্রতিটি মাত্রা। কথিত হচ্ছিল পারস্পরিক সংলাপে, আলাপে, বিলাপে একদিকে আনন্দ উৎসব মজা খেউড়, আর অন্যদিকে বুক চাপা কান্না। একটা দমবন্ধ চাপা রুদ্ধবাক মরে বেঁচে থাকার গল্প ‘লজ্জা’ আখ্যায়িত হয়ে মরমে গিয়ে ঘা দিয়েছে।
‘বিষাণ একটি সংস্থা’র অজস্র নাটকের মধ্যে, এই ‘লজ্জা’ নাটক সবভাবেই ব্যতিক্রমী। কোনো অবান্তর গিমিক এসে নাটককে বাড়তি বোঝাতে, বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেনি। তাছাড়া অনেক নাটকেই সব চরিত্র অভিনয় পদবাচ্য হয় না। মফস্বলি নাটকে হয়ে ওঠা, করে তোলার পক্ষে নিয়মিত মঞ্চায়নের সুযোগ থাকে না; ছ-মাস ন-মাস পরে অভিনয় হয়। তাই পড়ে থেকে নাটকের উত্তেজনা ক্রমশ মিইয়ে যায়। অভিনয় এবং চরিত্রায়ণ তাই, ক্রম মাত্রায় শিল্পী-কুশীলবেরা বহন করে নিয়ে যেতে পারেন না। বারবার একই বৃত্তেই সাজানো প্রসেসিং আবিষ্টমন আক্রান্তিতে গতানুগতিক থাকে। কিন্তু প্রসেসিং গুণেই, অনেকদিন পরেও ‘লজ্জা’ জ্যান্ত এবং জীবন্ত দর্শনের সমর্থন পেয়ে যায়। একটি সাহসী চেষ্টা। বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এই গ্রামীণ চর্চা যা করেছে, অনেকেই শক্তিমান হয়েও তা করেননি। সাজানো মূল্যবোধের কিছু গালগল্প বলা, বা বিদেশের অনুবাদে, যা প্রতিদিনের তাপমাত্রায় মেলে না, কেবলই ক্লিশে পুরাণকাহিনি বলে, পুরনো মদ নতুন বোতলে ঢেলে, গিলিয়ে আমাদের নাটক দেখার মেজাজকেই নষ্ট করছে—তার বিরুদ্ধে একটা বিপ্রতীপ প্রচেষ্টা তাই এই ‘লজ্জা’ নাটক। এই নাটকে, অনেকটা সিনেমাটিক কায়দায়, প্রচুর বিজনেস এসে অবান্তর কথা বলাকে প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছে। অনেক চরিত্র এসেছে, কিন্তু সেট আলাদা। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা এবং নিরপেক্ষতা তুলে আনার চেষ্টা এই প্রযোজনা করেছে। তাই প্রচলিত নাটকের চেহারা থেকে সরে এসে, ‘লজ্জা’ ভিন্ন স্বাদ দিয়েছে। নাটক যেমন দেখিয়েছে, তেমনই চরিত্রগুলি নিজেরা আন্তরিক চাহিদায় অস্তিত্বের সন্ধান করেছে। সব মিলিয়ে অল্পবিস্তর আড়ষ্টতা মেনেও সাধুবাদযোগ্য নির্মাণ। মাত্র ৫৫/৬০ মিনিটের নাটক অতি অবশ্যই বিরক্তিকর হয়ে ওঠেনি।
তাই নাটক ‘লজ্জা’ একটি সার্থক দায়বদ্ধতায় আমাদের মুগ্ধ করেছে। এই নাটক লিখেছেন সত্যজিৎ দত্ত। যতটা জানি, সামগ্রিক অভিনয়, দৃশ্য সংস্থাপন এবং নির্মাণ করেছেন সুশান্ত বালো। যদিও সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সংস্থার প্রাণপুরুষ তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটক উপযোগী বারবার ধ্বনিত শব্দ চয়ন করেছেন স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়।
খুব ভালো নীরব অভিনয়ের অভিঘাতে উজ্জ্বল ‘শিল্পী’ চরিত্রটি। এই চরিত্রে সুবীর ঠাকুরের অভিনয় সেরা প্রাপ্তি। কিছু সমান্তরাল চরিত্রে শুভা / গদাধর রায়, নগেন / রবি কুমার দে, পরেশ / উৎপল সাহা, সত্য / রাজকুমার কুণ্ডু, নিমাই / সাধন ঠাকুর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুগত প্রতিনিধি হয়ে স্বল্প সংলাপে টানটান ছিলেন। চমৎকার অভিনয়ে সারা নাটকের প্রাণ হয়ে থেকেছে বেকার চাকরিপ্রার্থী চরিত্র ‘রাম’। তার চায়ের দোকান চালাবার তাগিদ, তার হেরে না যাওয়ার নমুনা, তার সময়ের সাথে পাল্লা দেবার ক্ষমতা—সবই মাপা ঠান্ডা হিম বরফের সহনে তুলে এনেছেন অভিনেতা পবন পাল; তাকে স্যালুট। এছাড়া যুব সম্প্রদায়ের তুলনায় নিরুত্তাপ চরিত্র দেবু / ছোটন দাস, লাল / প্রণব কুমার কুণ্ডু, দীনু / প্রলয় সরকার মানানসই ছিলেন। অদ্ভুতভাবে নাটকে নিযুক্ত লটারি টিকিট বিক্রেতা প্রায় ব্যবহারহীন, সংলাপহীন চরিত্রে অচিন্ত্য ভট্টাচার্য্য শুধুই দেখে গেছেন; ব্যবহার করা যেত আরও। সাথেই, চায়ের দোকানের পাশে জীবনযুদ্ধ চালানো সাইকেল মেকানিক চরিত্রে মাত্র এক/দুটি সংলাপে কৃষ্ণ সরকার স্বাভাবিক অভিনয় কী, তা বুঝিয়ে স্নিগ্ধতা দিয়েছেন। একইভাবে উদ্বাস্তু ১ / অদ্রিজ ভট্টাচার্য্য, ও উদ্বাস্তু ২ / সম্রাট মণ্ডল চলে যায়।
ভালো লেগেছে শাক বিক্রেতা চন্দনা সিকদারকে। একই রকম ইউটিউবার ১ / মৌমি সরকার, ইউটিউবার ২ / অঙ্গিকা সরকার কিছুটা আড়ষ্ট, তবুও অসুবিধাজনক নন। এই নাটকের আলোক নির্মাণ ও প্রক্ষেপণ উত্তম কুণ্ডু এবং শব্দ প্রক্ষেপণ চিরদীপ সরকার নেপথ্য ভূমিকায় সাধুবাদযোগ্য। মঞ্চভাবনা চমৎকার, তবে বেঞ্চ দুটো বড্ড গতানুগতিক। সব মিলিয়ে ‘লজ্জা’ আমাদের সাম্প্রতিক অজস্র ঘটনার দিন-প্রতিদিনের গল্প। মানুষের সৃষ্ট বদলে লুটপাট জর্জরিত মানুষের লজ্জিত অস্তিত্বের অনুসন্ধান। আর কি এমন অগ্নিগর্ভ নাটক মঞ্চায়িত হতে পারবে? জানি না। কিন্তু নাটককার এবং নির্দেশককে নিশ্চিতই ভোলা যাবে না—এই চারটি প্রদর্শনে যেটুকু পাওয়া গেল। আর কোথায় তা মিলবে?
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142