CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
সুজয়া, শ্রীরামপুর (হুগলী): ঠিক দু'বছর আগের কথা। আজকের দিনেই মঞ্চের আলোয় প্রথমবার প্রাণ পেয়েছিল 'কলকাতা রমরমা' নাট্যদলের অনবদ্য প্রযোজনা ‘মাসাক্কালি’। আজ নাটকটির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এই বিশেষ লগ্নে, সেই নস্টালজিয়াতেই আরও একবার ফিরে দেখা।
'Real life is messy, and drama is a shaped version of real life.' — এই অমোঘ সত্যটিকে পাথেয় করে মঞ্চে মানুষের যাপিত জীবনের এক নিখুঁত রোজনামচা তুলে ধরেছিল নির্দেশক কন্যকার এই নাটকটি। লকডাউনের বন্দিদশা, মনখারাপ, দূরত্ব আর দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েনের মাঝে মানুষ আসলে কী খোঁজে? উত্তরটা খুব সহজ—সত্যিকারের একজন মনের মানুষ, যে নিঃশব্দে সবটুকু বুঝবে। না-বলা কথা আর অনুভূতির সেই মন কেমন করা আখ্যানই হলো ‘মাসাক্কালি’।
নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালোলাগা, ভালোবাসা, অভিমান আর বন্ধুত্বের বুনন দর্শকদের আচ্ছন্ন করে রাখে। পিসিমার চরিত্রে শ্রদ্ধেয়া পৌলমী চ্যাটার্জির অভিনয় এক কথায় অসাধারণ। ‘কালমৃগয়া’ বা ‘মেফিস্টো’-তে তাঁর যে দাপট দর্শক দেখেছেন, এখানেও তিনি ঠিক তেমনই ‘ওভার বাউন্ডারি’ হাঁকিয়েছেন। জীবনের কঠিন সময়ে ব্যথায় প্রলেপ দেওয়ার মতো এমন একজন পিসি কাম বন্ধু বাস্তবে সবার জীবনে থাকলে বোধহয় মনের অনেক কষ্টই নিমেষে দূর হয়ে যেত।
ডিজিটাল যুগে মনের কষ্ট কি কেবল মোবাইলের স্ক্রিনে টাইপ করেই মেটে? চিঠির সেই হারিয়ে যাওয়া নস্টালজিয়া আর গুরুত্বকে মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছিলেন পিসির ভাইপো গঙ্গা ওরফে কৃষ্ণেন্দুর চরিত্রে অয়ন দত্ত। তাঁর প্রতিটি শব্দযাপন সরাসরি বুকে গিয়ে ধাক্কা দেয়। মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছানোর এই অভিনয়ে তিনি এক কথায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে মধুজার চরিত্রে আভেরী সিনহা রায় প্রমাণ করেছেন, ‘গপ্পো মীরের ঠেক’-এর দুর্দান্ত কণ্ঠস্বর হওয়ার পাশাপাশি মঞ্চেও তিনি সমানেই সাবলীল। রাগ, অভিমান আর ভালোবাসার ছোট ছোট অনুভূতিগুলো তাঁর অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
অর্জুন মিত্তালের চরিত্রে কৌস্তভ মুখোপাধ্যায় তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ছকের বাইরে গিয়ে এক অন্য মেজাজে ধরা দিয়েছিলেন। তাঁদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া অটুট বন্ধন যেন রবীন্দ্রনাথের সেই চিরন্তন লাইনটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়—"ওলো সই ওলো সই আমার ইচ্ছা করে তোদের মতো মনের কথা কই।"
বন্ধুত্বের উদযাপন আর না-বলা গল্পের এই যাত্রাকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল নাটকের কারিগরি দিক। অম্বরীশ দাসের মঞ্চভাবনা, শুভঙ্কর দের নিখুঁত আলোকপাত এবং জয় সরকারের আবহ সঙ্গীত এই প্রযোজনাকে এক পূর্ণতা দিয়েছে। শুভদীপের স্থিরচিত্র এবং অর্ণবের তৈরি পোস্টারও সমানভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে নৃত্যশিল্পী সম্পার উপস্থিতি এবং মঞ্চে গানের ব্যবহার দর্শককে আক্ষরিক অর্থেই মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। হঠাৎ বৃষ্টি, ছাতা আর অনুপম রায়ের ‘বন্ধু চল’ গানের আবহে তৈরি হওয়া মুহূর্তগুলো বুঝিয়ে দেয়—"মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।"
লকডাউনের শত কষ্টের মাঝেও বন্ধুত্বের এই যে জয়গান, তা ‘মাসাক্কালি’-র মূল সুর। দেখতে দেখতে সাফল্যের সাথে দু'টি বছর পেরিয়ে গেল, অথচ দর্শকদের মনে এর রেশ আজও অমলিন। এমন একটি মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য কন্যকা এবং ‘কলকাতা রমরমা’ নাট্যদলকে দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির অনেক শুভেচ্ছা ও কুর্নিশ। থিয়েটারের মতো এমন একটি সুন্দর শিল্পকে মানুষের হৃদয়ে এভাবেই চিরকাল বিরাজমান রাখুক তারা।
Compiled & Edited By Rajdeep Saha
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142