CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: বরিষা ‘থিয়েটার ফর ইউ’ (Theater for U) সংস্থার এক দিবসের মনমিলন উৎসবে গত ১১ই মার্চ তপন থিয়েটারে অভিনীত দ্বিতীয় নাটকটি ছিল টানটান উত্তেজনার। মঞ্চে বসেছিল আদালত। শিলিগুড়ি ইঙ্গিত দলের অকারণ শুদ্ধ জীবনকে খুন করে অপরাধের তাণ্ডব চালাবার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের নাটক এটি। নাটকের নাম ‘অমীমাংসিত’। প্রতিবাদে শামিল হতে চাওয়া, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তি চাওয়া মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের করণীয় কর্তব্য নির্ধারণ কী হওয়া উচিত, তা মীমাংসা করার চেষ্টারই নাটক ছিল এটি। আপাদমস্তক এই সময়ের জরুরি বার্তাজ্ঞাপক এই কোর্টরুম ড্রামার কৌতূহলী কার্যকলাপ আর আদালতের রায় শোনার আগ্রহে দর্শকেরা অধীর ছিল। কিন্তু রায় ঘোষণা সম্ভব হয়নি। এইভাবেই পারিবারিক কোন্দলে এক অস্থির উত্তপ্ত বাতাবরণ বয়ে এনেছিল ইঙ্গিত নাট্যসংস্থা। এক ঘণ্টা সময়কালের এই “অমীমাংসিত” লিখেছেন সৌমিত্র চ্যাটার্জী। অভিনয়-উপযোগী সম্পাদনা, সংযোজন ও সামগ্রিক পরিকল্পনা এবং নির্দেশনা করেছেন দলের নির্দেশক আনন্দ ভট্টাচার্য।
এই প্রায় প্রতিবাদহীন ঘুমন্ত সমাজের দিকে তাকিয়ে, সময়ের চূড়ান্ত যন্ত্রণাকথায় দগ্ধ হয়ে শিলিগুড়ি ইঙ্গিত সংস্থা এমন একটি জ্বালাময়ী নাটকের মঞ্চায়ন প্রসঙ্গে এগিয়েছে। এই নাটকে আছে এক প্রতিবাদী জীবন হত্যার বিচার বিষয়ক অভিযোগের ভিত্তিতে উত্থাপিত চেতন-চিন্তা কথা। নাটকে আছে মহাভারতের চার নামে ধন্য এই সময়ে হতভাগ্য এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও ন্যায়-অন্যায় বোধের সংজ্ঞাহীনতার দিশা খোঁজা। সুখ-শান্তিতে ভরা সংসারে ছিল বাবা অর্জুন মিত্র, মা সুভদ্রা মিত্র, ছেলে অভিমন্যু মিত্র এবং পুত্রবধূ উত্তরা মিত্র। কিন্তু ছেলে অভিমন্যু খুন যাওয়ায় ভাঙনের তীরে এসেছে এদের সকলের জীবনকথা। কোর্টে চূড়ান্ত রায় হবে আজ, অভিমন্যুকে তার বাবা অর্জুন মিত্র হত্যা করেছে। মা সুভদ্রা তাই অভিযোগ তুলে নালিশ জানিয়েছে প্রশাসনের কাছে। কাজেই তার নালিশ অনুসারে কাঠগড়ায় অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অর্জুন মিত্র। এখন কী হয় কী হয়, চোখ-কান খাড়া হয়ে আছে দর্শকদের।
সুদীপ্ত কুমার চক্রবর্তীর গল্প নিয়ে এই ‘অমীমাংসিত’ নাটকটি আন্তরিক মননে ও কৌশলে লিখেছেন সৌমিত্র চ্যাটার্জী। যেখানে একজন আদর্শবাদী বাবা, অর্জুন মিত্র, সে তার নিজের ছেলে অভিমন্যুকে সত্যের জন্য জীবন ধারণ করতে শিখিয়েছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শিখিয়েছিল। বুঝিয়েছিল প্রতিবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের সাথে মোকাবিলা করা যায়। কালক্রমে সেই ছেলে এই চলমান সময়ের অন্যায়-অবিচার-ব্যভিচারের বিরুদ্ধে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে বিভিন্নরকম গণ-প্রতিবাদে শামিল হতে শুরু করেছিল। তারপর একদিন সে রাজনৈতিক চক্রান্তে খুন হয়ে যায়। তার এই মৃত্যুর জন্যে সন্তানহারা পুত্রশোকে কাতর হয়ে মা সুভদ্রা দেবী বাবাকেই অপরাধী বলে অভিযোগ দায়ের করেছিল। কারণ বাবাই তাকে যুগোপযোগী করে, আপসকামী মানুষ হতে দেয়নি। তাই কোর্টে সেই বাবারই বিচার চলছে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো বাবার শাস্তি কী হতে পারে তা নির্ধারণ করার জন্যেই বাদীপক্ষ-বিবাদীপক্ষ দুই তরফে মরিয়া রয়েছে। শাস্তির পক্ষে-বিপক্ষে চলছে জেরার চাপানউতোর।
শিলিগুড়ি থিয়েটার একাডেমির নাট্যজন কুন্তল ঘোষের আবহ, বিমান দাসগুপ্তের আলো, শক্তি প্রসাদ আইচের রূপসজ্জায়, সুদীপ্ত রায়, শৈবাল মজুমদারের নিপুণ মঞ্চভাবনাকে সমীপেন্দু দত্তের কৌশলী নির্মাণে এই ‘অমীমাংসিত’ নাটক এক সংযত ও সুশৃঙ্খল প্রযোজনা। কিছুটা অভিনয় প্রক্রিয়া এবং নাটকের চলন ফ্ল্যাট হয়ে আছে। কিছু মুহূর্ত আরও নাটকীয় হবার দাবি রাখে। তবুও ইঙ্গিত দলের নাট্যভাবনা মন্দ নয়।
বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন: সূত্রধর / মিঠু সরকার, অর্জুন মিত্র / সলিল কর, টিভি ঘোষিকা / চন্দ্রাণী মুখার্জী, মুহুরি / চন্দন সরকার, উকিল শঙ্কর চৌধুরী / অশোক ঘোষ, উকিল নারায়ণ মুখার্জী / শৈবাল মজুমদার, বিচারপতি / কুমকুম কর দেব, অর্জুন-পত্নী সুভদ্রা / জবা ভট্টাচার্য, উত্তরা / পারমিতা নিয়োগী এবং অভিমন্যু / কার্তিক রায়। বিশেষভাবে নজরকাড়া অভিনয়ে সলিল কর, পারমিতা নিয়োগী, অশোক ঘোষ, শৈবাল মজুমদার এবং কুমকুম কর দেব এই নাটকের সামগ্রিক সাফল্যের স্তম্ভ-সমান। কিন্তু সমগ্র নাটকের ঘটনাক্রমের উৎসে বিশেষ সাফল্যেই আছেন সুভদ্রা চরিত্রে জবা ভট্টাচার্য। তিনি চরিত্রটি কিছুটা স্থির স্থিতিতে ধরেছেন। সুভদ্রা চরিত্রের অভিমত এবং সিদ্ধান্তে অটল ছিল বলেই এই নাটকটি উপস্থিত দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কারণ নাটকটা মনে আনে অভয়ার নির্মম হত্যারহস্যের এবং খুনিদের খুঁজে বের করার অমীমাংসিত বিষয়কে। তাই রাজ্যজুড়ে তোলপাড় তোলা সেই মেয়ের ধর্ষণ ও মৃত্যু আর অভিমন্যু হত্যা পরস্পরের পরিপূরক। এই মর্মেই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যায়ন এই, ইঙ্গিতের ইঙ্গিতপূর্ণ ‘অমীমাংসিত’ প্রযোজনাটি।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142