CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: কলকাতা রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ সংস্থার, বাদল সরকারের লেখা “পাগলা ঘোড়া” একটি অনবদ্য প্রযোজনা। দেড় ঘণ্টা সময়কালের এই টানটান নাটক বসিয়ে রেখে ভাবিয়েছে, নারীর অন্তর-যন্ত্রণা কীভাবে ধারাবাহিকতায় আজও একইভাবে চলে আসছে। অপদার্থ পুরুষের সাথে ঘর করতে গিয়ে বা দ্বিধাগ্রস্ত পুরুষের সাথের সম্পর্কে নেমে কোনো এক নারীর ইচ্ছাপূরণ, বঞ্চনা থেকে ক্রমে মৃত্যুতে কত অনায়াসে চলে যায়। এই নাটকে তাই জ্বলন্ত চিতায় এক নারী দাহ হচ্ছে। আর চার পুরুষ শববাহকেরা দুই বোতল রাম খেতে খেতেই বিশ্লেষণ করে চলেছে, কেন এই নারী, বা আরও অনেক মেয়ে এই সমাজের সীমাবদ্ধ আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণায় জ্বলে-পুড়ে কীভাবে মরছে। ভেতরের এক মৃত আত্মা একদিন লজ্জায়, অপমানে, পুরুষদের হেলাফেলায় চূড়ান্ত মৃত্যুবরণ করছে। জীবিত-মৃত এক অস্তিত্ব-সংবাদে, নানা বিভঙ্গে উঠে এসেছে নারীর আত্ম-আবিষ্কারের অবরুদ্ধ সেই বেদনাদায়ক বর্ণনা। শুধু আকুতির আকুলতায়। চোখের চাওয়ায়। চারে মিলে এক হওয়া নারী সমষ্টিতে একত্রিত। তাই চার নারীই সবভাবেই পরস্পরের পরিপূরক। চার মদ্যপ পুরুষও সামাজিক-সাংসারিক চাওয়া-পাওয়ায়, এদের সাথে সম্পর্কিত থেকে, কোনো জীবনধারণ-কল্পের আশু সুবিধা দিতে না পারা ব্যর্থতার জ্বালা বয়ে চলা মাত্র একজন স্বামী, প্রেমিক কিংবা সহৃদয় বন্ধু মাত্র। পুড়ছে, সবই জ্বলন্ত, মনও পুড়ছে আগুনে।
বাদল সরকারের লেখা নারীর মর্মান্তিক বাস্তবিক যাপনের উপর চিরকালীন সত্য উন্মোচিত করা ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটক, প্রযোজনায় সার্থক। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক উন্মাদ উন্মাদনায় আগুন পাশে নিয়ে এই নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কলকাতা রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ সংস্থার নির্দেশক ড. দানী কর্মকার। আলো-আবহে মঞ্চে একেবারেই চমৎকার প্রসেনিয়াম থিয়েটার। মাত্র ১৫/১৬ বছরে উঠে আসা এই দলের ব্যুৎপত্তি তাই ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকের সফল মঞ্চায়নে আস্থা জাগিয়েছে। ইতিপূর্বে এই অভিজ্ঞতা ছিল না বলে আমি নিজেই কুণ্ঠিত বোধ করছি।
মিউনাস সংস্থার টানা ২৪ ঘণ্টার, বাদল সরকারের জন্মশতবার্ষিকীতে স্মরণ ও শ্রদ্ধায় ১৯টি নির্বাচিত ও আমন্ত্রিত দলের অনেক সুচিন্তিত নাট্যায়নের মধ্যেই, এটিও নিজস্ব মর্যাদায় চমৎকার সৃজনে অভিনীত হয়েছিল তেপান্তর নাট্যগ্রামে “এবং আমরা” দলের ব্ল্যাক বক্সের ফ্লোরে। গভীর রাতে। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে দুটোয় শুরু হয়েছিল নাটক। এক মায়াবী চেহারায় চার নারী একই পোশাকে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁদের চরিত্রায়নে। সর্বমোট আটজন পুরুষ-নারী (৪+৪) বিচিত্র ধরনের অভিনয়ে ঘুম কেড়েছিলেন। চোখে জল নিয়ে কেঁদেছে এক নারী চরিত্র। আলোক-বিভ্রান্তি হয়েছিল। চূড়ান্ত তাই সাদা ফ্লাড লাইট দিয়ে টেনে নিলেও, নাটকের প্রকাশে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি। দানী কর্মকার গুণী ও সৃজনশীল মানুষ। নাটক দেখেই বুঝেছিলাম, মানুষের মন কর্ষণে অভিজ্ঞ, কল্প-মননের সাহিত্যানুরাগী এই মানুষের নির্মাণ আলাদা অনুভূতি দিতে পারবে। কারণ এক নারী আর এক পুরুষ যেন ঘুরেফিরে বিভিন্ন তরঙ্গে ভেসে চলেছে জীবন-সমুদ্রে জ্বলা দেহ নিয়ে। নাটকের অপরাপর নারী-পুরুষও গিয়ে মিশেছে। গল্প তাই স্থির। কিন্তু চলন অস্থির। আগুন কি চিতায় না সংসারে, সমাজে অহরহ জ্বলছে। ষাটের দশকের শেষভাগে সম্ভবত নাইজেরিয়ায় বসে লেখা এই পাগল-করা, ‘পাগলা ঘোড়া’-র তাৎপর্য আজকেও যে কত প্রাসঙ্গিক! রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ তার স্বরূপ প্রকাশ করেছে। আজকের সমাজে, সংসারে, মানসিকতায় সম্পর্কের জটিলতা বেড়েছে। তাই কোনো নারী-পুরুষ পারস্পরিক জীবনে দুয়ের সাথে স্বচ্ছন্দ ও স্বচ্ছতায় নেই। মনের ভেতরে যে আগুন, তাই যেন ছিটকে পড়ছে চতুর্দিকে। রাজনীতি চায় এই বিবাদে ক্লান্ত হোক জীবন। মুক্তি তবে দেবে কে? ভোগবাদ তো বাজার সাজিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
এই নাটকের সামগ্রিকতা অতি যত্নে শিল্পী-কুশীলবেরা অনুশীলন করে রপ্ত করেছেন। ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকে সাতু চরিত্রে গৌতম কুমার রায়, পুড়তে থাকা আধপোড়া অগ্নিদগ্ধ মেয়ে ও মালতীর ভূমিকায় বর্ণালী কর্মকার অভিনয়ের গুরুত্বে নজর কেড়েছেন। একইভাবে শুভায়ন রায় (কার্তিক), রাজদীপ সাহা (হিমাদ্রি) এবং শশী চরিত্রে বিশ্বজিৎ রায় একই মাত্রায় আন্তরিক ছিলেন। বিশেষ প্রাপ্তি হয়েছিল সুমনা ঘোষের ‘মিলি’-র মনের তরঙ্গে মিশে গিয়ে পাগলা ঘোড়া নাটকের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা ভূমিকাটি। অত্যন্ত সাবলীল ছন্দে মুক্তা কর লছমি চরিত্রটি ধরেছেন। রিকিতা শর্মা একটি মেয়ে অসংখ্য নারীর স্বপ্নকথায় ঘর-সংসারের মায়ায় বিভোর থেকেই এই নাটকের দ্যোতক ভূমিকা হয়েছিলেন।
‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকের সাংকেতিকতা, অনিবার্যতা, অপরিহার্য চলমান শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা ভাবাতে পেরেছে বলেই এইসব শিল্পী-কুশীলবদের নাট্যশিক্ষাকে শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। নির্দেশক ড. দানী কর্মকার সফল। তিনি যে কাজে বাদল সরকারকে বুঝে নিয়ে নারীর আজকের অবস্থান নির্ধারণ করেছেন, সে মুগ্ধতা অনেক নাটক দেখেও মুছে যায় না। এই মর্মেই রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধকে স্মৃতিতে ধরে রাখতেই হয়।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142