CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: ইতিমধ্যেই বহু শহরে, নাটকের উৎসবে বেলঘরিয়া অঙ্গন সংস্থার নাটক ‘স্যাক্রিফাইস’ প্রযোজনাটি সাফল্যের সাথে অভিনীত হয়ে চলেছে। স্যাক্রিফাইস মানে ত্যাগ। বোঝাপড়া, সমঝোতার উৎস। অন্যের দাবি মিটিয়ে পরস্পরের সাথে বেঁধে বেঁধে থাকার জন্যে একপক্ষীয় ত্যাগ কতটা জরুরি, এই নাটক সেই স্যাক্রিফাইস কথার বহু মাত্রার কথাই বলেছে। দেবব্রত মাইতির চমৎকার মঞ্চভাবনা নিয়ে মদন হালদার এক বাড়ির ভেতরে আরো ঘর, আরো সংসারের আভাস সুন্দর ভূগোলের মধ্যে তুলে ধরেছেন, যা নাট্যক্রিয়ায় বিশেষভাবে মিশেছে। এই দলের তপন বিশ্বাস একজন সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ। কান দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত এই মানুষ তাই পরিপাটি করে, আবহের সুরে-তালে নাটকের অন্তর্ঘাত, প্রত্যাঘাত এবং প্রতিঘাতগুলি বেছে বেছে ধরেছেন। মঞ্চ-অভিজ্ঞ অভিনেতা অভিজিৎ মজুমদার সেই সূত্রেই আলোক-চিন্তায় সাযুজ্য খুঁজেছেন। সামান্য রঙেই রূপসজ্জার কাজ সেরেছেন লিজা ভট্টাচার্য। রীণা ভট্টাচার্য সেই রঙেই চরিত্র, খোলস-পোশাকের সংযত স্বাভাবিকতা ধরেছেন। মঞ্চ গুছিয়ে ঘষামাজা করেছেন মানু দাস এবং অর্ণব কাজি।
এইসবের সূত্র-উৎসে আছে বেবি সেনগুপ্তের লেখা এই ‘স্যাক্রিফাইস’ শীর্ষক দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া, আর আমাদের সাথে জড়িয়ে থাকা চারপাশের অজস্র জীবনের হৃদয়কথা বলার এই নাটক। এক ভাড়াটে পরিবার আর বাড়ির মালিকের নিত্য খুনসুটি, একই বিতণ্ডা, অনায়াসে সব ভুলে আবার চায়ের কাপে জমা গল্প যখন সুখ-দুঃখের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন কে যে কার সাথে, কোন পরিবারের সদস্য বনে যায়, তা বুঝে নিতে গেলেই এই নাটক চেনা যায়। ইতিমধ্যেই অনেক প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া অন্ধকারের স্মৃতি ভেসে এসে চোখ ঝাপসা করে দেয়। এই নাটকের বিন্যাসে সেই সংবাদের কুশলী জালে অনেক জীবন, অনেক কথা, হাজারো ব্যথা এক নদীতে মিশে সাগরসঙ্গমে যেন চলেছে। তাই একটি ঝোড়ো খরস্রোতা পাথুরে নদী একটু সমতল খুঁজে সামনে এগিয়েছে। তবে ঐশীর দাদা বাবার শাসনে যেভাবে মৃত্যুমুখে চলে যায়, তার পরিণতি মর্মান্তিক সংবাদ। যা নিয়ে বোন ঐশীর ভাববিহ্বলতা, চিত্তচঞ্চলতা এবং এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। কৃতকর্ম অবসাদের ভিন্ন রূপ, বাবা বৈদিক বাবু। সেখানে বাস্তব বিশ্বাস এবং সত্যতায় নাটক গড়ে নেবার ইচ্ছা-প্রাবল্য কাজ করেছে। যেখানে এতটা স্যাক্রিফাইস প্রতিনিয়ত চলছে— মা জয়া, মেয়ে পরী, ফুল, ঐশী, দেবেশের প্রতিদিনের সুখী-খুশি থাকার খুচরো লেনদেন, সেখানে সেই মৃত সন্তান এই ঝগড়া-ঝঞ্ঝাটের মধ্যেই এই আদ্যোপান্ত বুঝতে কেন ব্যর্থ হয়েছিল, তা রীতিমতো ভাবায়। কিছুটা হলেও একটা গ্যাপের ম্যাপে আছে এই প্রসঙ্গ। নিশ্চয়ই বাস্তব সত্য আর নাটকীয় সত্য মিলিয়ে দেওয়া সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। বলার কথার প্রাবল্য-চাপে কিছু এলোমেলো উড়ো বাতাসের খেয়াল আসেই। যাই হোক, ‘স্যাক্রিফাইস’ সব মিলিয়ে যথেষ্ট মনোগ্রাহী উপস্থাপনা।
সকলেই ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রীর দক্ষতা নিয়েই মঞ্চে এসেছেন। যার মধ্যে বিচিত্র শেডে রঙিন লাগে দেবেশ / তপন বিশ্বাস এবং পরী / সোমা ব্যানার্জী— এই দুজনকে। অনেক না-বলা কথা লুকিয়ে কিরকম স্যাক্রিফাইস করতে হয়, তাই এঁরা যেন শেখায়। দুরন্ত-দুর্দান্ত বাড়ির ছোট, কিছুটা ডানপিটে মেয়ে ফুল, চমৎকার। গর্বিতা ঘোষ চরিত্রটি সুন্দর মাত্রায় এবং স্বাভাবিক-সাবলীলভাবে গড়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে অভিনয় করেছি। জানা ছিল না এই প্রখরতা তাঁর চরিত্রে দেখতে পাব। যদিও অনেক অন্য নাটকে গর্বিতা ঘোষের অভিনয় দেখেছি। মা জয়া চরিত্রে বেবি সেনগুপ্তের ভূমিকায় অনেক ভূমিকম্প ধারণ করার প্রাঞ্জলতা, প্রচুর সহনশীলতা, ব্যক্তিত্ব, আত্মসমর্পণ, আত্মসম্মানবোধের বিবিধ মাত্রা এই নাটকের বিশেষ উচ্চতা। সাদামাটা কিছু করতে উদগ্রীব সুজনের শুকনো পাংশুটে চেহারার মধ্যেই রতন দাস অনবদ্য ভূমিকা। খিটখিটে, ভাড়া দেওয়া বাড়ির মালিক বৈদিক বাবু কেন চঞ্চল-অস্থির অনেক হারিয়ে ফেলা এক মহাজীবন, তা কোন মুহূর্তে নীরবে মাধুর্যময় করা যায় কিনা ভাবতে অনুরোধ। কারণ অত্যন্ত গতিশীল এই নাটক একটা মুহূর্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে আশ্রয়দাতার অন্তর-অভিমুখ। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত অভিমত এমন। একমত না হলেও ‘স্যাক্রিফাইস’ এই চলমান চিত্রেই চলে-ফিরে বেড়াক।
কাঁচরাপাড়া ফিনিকের মিলন সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২৬-এর ২২টি নাটকের মঞ্চায়ন-ভিড়ের মধ্যে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি নাটকের প্রারম্ভিক উপস্থাপনা ছিল এই নাটকটি। হালিশহর ইউনিটি মালঞ্চের সদ্য নির্মিত বিনোদিনী মঞ্চে এই নাটকের দর্শক ছিলেন বহু গুণী নাট্যজন। সকলেই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এই ‘স্যাক্রিফাইস’ নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নির্দেশনার মুন্সিয়ানায় অভি সেনগুপ্তের নাট্যনির্মাণ চাতুর্যকে। এই সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট প্রয়োগকার হিসাবে তাঁকে সম্মান জানাচ্ছি।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142