CALL FOR PAPERS - SEPTEMBER, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: হাওড়া কালি কুণ্ডু লেনের ‘সারস্বত’-এর সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত ৭ই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জ্ঞানমঞ্চের প্রায় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে তাদের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপিত হলো। সারা রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সংগীত, আবৃত্তি ইত্যাদি বিষয়ের চর্চাকারীরা এই দলে একত্রিত হয়ে একটি ‘আনন্দ পাঠশালা’ রচনা করেছেন। সকলের আন্তরিকতা এবং নাটকের প্রতি অনুরাগের কারণে সারস্বত বিগত ছয় বছরের পথচলায় এ যাবৎ চারটি নাটক নির্মাণ করেছে। তাদের সাম্প্রতিকতম পঞ্চম নাটক ‘শূন্য হৃদয় দান’-এর প্রথম মঞ্চায়ন এদিন জ্ঞানমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়।
নাটকের গল্পে উঠে এসেছে কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত, রবীন্দ্রপ্রেমী, বনেদি পরিবারের জীবনযাত্রার ইতিবৃত্ত। ‘দ্য গ্রেট ব্যানার্জী ভিলা’ বলে পরিচিত এই পরিবারে বর্তমানে অর্থাভাব থাকলেও বিশাল বাড়িটি আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করে আজও টিকে আছে। বাড়ির তিন ভাই-ই আজ প্রয়াত। বর্তমান পরিবারে আছেন আগের প্রজন্মের এক বয়স্ক নারী, বিধবা তিন জা এবং বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। তবে তাঁদের অধিকাংশই কর্মব্যস্ততায় বাইরে থাকেন। কল্যাণী এই বাড়ির বড় বউ, যিনি একাই এই বিশাল অট্টালিকা সামলান। নাটকের শুরুতে দেখা যায়, বাড়ির আইনানুগ সুষ্ঠু বণ্টনের জন্য কল্যাণীর আহ্বানে পরিবারের সদস্যরা বহুদিন পর একত্রিত হয়েছেন। এসেছেন আইনজীবীও। হালকা মেজাজে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উঠে আসে ফেলে আসা অতীত আর বর্তমানের মেলবন্ধন। প্রতিটি চরিত্রের সংলাপে ফুটে ওঠে সময়ের ক্ষোভ, দুঃখ আর অভিমান।
নস্টালজিক স্মৃতিমেদুরতা ভেদ করে বিচিত্র তরঙ্গে স্ফীত হয়ে ওঠে আনন্দ, দুঃখ, ক্ষোভ ও ভালোবাসা। এই মিশ্র অনুভূতির আড়ালে বেরিয়ে আসে বহু না-বলা কথা, বঞ্চনা আর অসম্মান। আইনি জটিলতা ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার বৈষম্যে জীবনবোধের সমীকরণগুলো ওলটপালট হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কি বাড়িটির সুষ্ঠু বাঁটোয়ারা হয়? বাড়িটি কি টিকে থাকবে, নাকি সবাই একে একে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাবে? এই নিঃসঙ্গ যাপনের শরিক নাটক ‘শূন্য হৃদয় দান’ মূলত এই উত্তরগুলোই খুঁজেছে। এটি অনির্বাণ ঘোষ রচিত একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী নাটক, যা ঘটনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে চরিত্রের অন্তদ্বন্দ্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে। এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের এই নাটকের আবহ ও রচনায় অনির্বাণ ঘোষের মুনশিয়ানা স্পষ্ট।
নাটকের মূল কাঠামো, দৃশ্যপট, পোশাক পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন জ্যোতির্ময় পণ্ডিত। আলোক সজ্জায় ছিলেন চন্দন দাস। মঞ্চে অভিষেক কয়াল অঙ্কিত দুটি অপূর্ব চিত্রপট দৃশ্যকল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এক যৌথ পরিবারের আবদ্ধ পরিস্থিতিতে নারীদের প্রজন্মান্তরের ক্ষোভ, অভিমান ও অধিকারবোধের লড়াই এখানে চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে। অনিবার্য শান্তির প্রত্যাশায় যেখানে পরিস্থিতিকে মেনে নিতে হয় এবং শেষমেশ সবাই যার যার গন্তব্যে ফিরে যায়।
তবে নাটকের কিছু চরিত্রের বাচিক কুশলতার অভাব এবং পারস্পরিক মেলবন্ধনের ঘাটতি নজরে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত দীপ্ত মুহূর্তগুলো অনুপস্থিত ছিল। তবুও চমৎকার আলোকসম্পাত ও মঞ্চ সজ্জার অভিনবত্বে নাটকটি দর্শকদের মুগ্ধ করতে পেরেছে।
অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বড় বউ কল্যাণীর চরিত্রে দেবযানী চ্যাটার্জী অত্যন্ত সহনশীল ও সাবলীল ছিলেন। করপোরেট ব্যক্তিত্ব শ্রী-এর চরিত্রে সোমালি কর এবং কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরিজীবী মানবীর ভূমিকায় মৌসুমী ভট্টাচার্য প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। মানসিকভাবে কিছুটা অস্থির উর্মিলার চরিত্রে সুস্মিতা পালের অভিনয় আরও একটু সংবেদনশীল হতে পারত। হাসিমা চরিত্রে অলিভিয়া মুখার্জী এবং আইনজীবীর চরিত্রে পায়েল পাল যথাযথ ছিলেন। তবে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কামিল চরিত্রে জ্যোতির্ময় পণ্ডিতের শক্তিশালী অভিনয়।
সব মিলিয়ে ‘শূন্য হৃদয় দান’ পারস্পরিক অভিনয় ও চারিত্রিক ব্যঞ্জনায় যতটা সমৃদ্ধ হবে, ততই তা দর্শকমনে স্থায়ী আসন করে নেবে।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142