CALL FOR PAPERS - MAY, 2026
দুলাল চক্রবর্তী: গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি চুঁচুড়া রবীন্দ্রভবনে হাওড়া জেলার রামরাজাতলার নাট্যদল ‘কথক পারফর্মিং রেপার্টয়ার’-এর আয়োজনে দুইদিনের একটি নাট্যোৎসব “সিসৃক্ষা নাট্য যাপন” কাব্যে-দৃশ্যে মিলেমিশে হয়ে গেল। সংস্থাটি যে প্রচণ্ড নাট্য-শ্রদ্ধাশীল দল, তার বিশেষ নমুনা মিলল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ভরতের নাট্যশাস্ত্রের শ্লোকবাক্য ও স্তুতি উচ্চারণের মাধ্যমে কেন্দ্রে একটি প্রদীপ রেখে উপস্থিত সকলে রবীন্দ্রভবনের লবিতে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে নাট্যবন্দনায় মগ্ন হয়েছিলেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি এই আয়োজনের শেষ নাটক ছিল, আয়োজক সংস্থার বিরতিহীন ১০০ মিনিটের নিজস্ব প্রযোজনা— “উলগুলান”।
১৮৯৯-১৯০০ সালে ছোটনাগপুরের সাহেবদের হাত থেকে আদিবাসীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা চাওয়া এবং ত্রাণ পেতে বিপ্লবে শামিল হওয়া অতিষ্ঠ আদিবাসীদের আত্মকথা বলেছে এই নাটক। একটি সুচারু উপস্থাপনা। নাটকে তৎকালীন ইতিহাসকে যথেষ্ট সংক্ষিপ্ত এবং সম্পূর্ণভাবে মঞ্চে এনেছে কথক পারফর্মিং রেপার্টয়ার সংস্থা। আত্মরক্ষার্থে সাহেবদের ওপর যে আদিবাসী আক্রমণ নেতা বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল, যে সংগ্রাম ‘প্রবল বিক্ষোভ’ বা “উলগুলান” নামে পরিচিত, সেই ইতিহাসের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এবং শোষণের সংবাদ-ইতিবৃত্ত এই নাটকে উঠে এসেছে অত্যন্ত সাহসী, নান্দনিক এবং শিল্পসম্মতভাবে। বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ভূখণ্ডে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অরাজকতা, সংশ্লিষ্ট ভূস্বামী, জমিদার, রাজা, ইংরেজ শোষক মহাজনদের বিরুদ্ধে যা ছিল এক নিরীহ মানুষের সম্মিলিত আত্ম-গণজাগরণ। মাথা নিচু করে ইংরেজ শাসনব্যবস্থাকে একমাত্র না ভাবা সেই গণবিপ্লব আজকেও প্রাসঙ্গিক। তাই এই প্রযোজনা ঘুমিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে সচেতন প্রজ্ঞাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। ইংরেজ আমলে ‘মুণ্ডারাজ’ কায়েম হোক না হোক, আদিবাসীদের জন্যে ভূমি-সংস্কৃতি-সম্মান রক্ষা পাক না পাক, একটা আন্দোলনের উত্তপ্ত বাতাস এই “উলগুলান” যথাযথ উচ্চতর উচ্চারণে তুলে ধরেছে। ভারতবর্ষের মানুষের মাথার উপরে চাপিয়ে দেওয়া দমন-পীড়ন নীতির বিরুদ্ধে যা উত্তেজক উপমা উপস্থাপনা। তাই চলমান ইচ্ছেপূরণ ম্যাড়ম্যাড়ে নাটকের স্ব-বিজ্ঞাপিত নাট্য দরবার-বাজারে, এই ‘উলগুলান’ নাটকের পক্ষে বলার জন্য কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়। তাই না দেখলে বর্ণনা করে এই নাটকের গুণগত অবস্থান ব্যক্ত করা কিছুতেই সম্ভব না। কারণ চমৎকার ছবিতে, নাটক-উপযুক্ত কম্পোজিশন ও কোরিওগ্রাফিতে এই বিরসা মুণ্ডার মহার্ঘ জীবনের প্রতি এবং আদিবাসী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে সংস্থা। সেই শ্রদ্ধায় আমাদের ঘুমন্ত অস্তিত্বকেও জাগাতে চাওয়া হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। তাই আগামীর যেকোনো সম্ভাব্য বিদ্রোহ-মর্মের প্রজ্ঞাতে এই প্রযোজনা উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরসা মুণ্ডার সেই ত্যাগ-তিতিক্ষায় অধিষ্ঠিত, ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের সূত্রপাতকে, ঘটনায়-ব্যঞ্জনায় বিপ্লবের মধ্যেই উদ্দীপ্তভাবে তুলে ধরা অনায়াস হয়েছে। এমন আর কোনো প্রযোজনা আমি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
এই প্রযোজনার পরিকল্পক, উদ্ভাবক ও পরিচালক কৃতি মজুমদার একজন গুণী নাট্যসৃজক এবং বলিষ্ঠ সংগঠক। তাই তরুণ-তরুণীসহ অনেক বর্ষীয়ান পুরুষ-মহিলা শিল্পীদের একত্রিত করে চমৎকার একটি নাটক নির্মাণ করেছেন। ইতিমধ্যেই নাটকের ৭টি মঞ্চায়ন হয়ে গেছে। সব শিল্পী-কুশীলবেরাই শারীরিক কসরতে এই নাটকের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। সাহেবদের আদিবাসী শোষণের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, নিজেদের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে প্রতিটি চরিত্র যেমন উদ্দীপ্ত তেমনই মরমি। নজর কেড়ে নিয়েছে কম্পোজিশন ও কোরিওগ্রাফি, এবং বাদ্যের সুসংহত ব্যবহার। নাটকের বাইরে আলাদা দেখাবার প্রবণতায় নাচ-গান বা অকারণ কোনো হুল্লোড় ছিল না। সমস্ত মঞ্চ জুড়েই ঘটেছে বিভিন্ন মুহূর্তের বিন্যাস। প্রতিটি ভূমিকাই নিজে চরিত্র হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে। বিরসা মুণ্ডার ভূমিকায় সুজন ঘোষের দাপট এবং স্পর্ধাকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। আদিবাসীদের কথা বলতে এসে স্বতন্ত্রভাবে ছৌ-নৃত্যশৈলী থেকে যে ফুটওয়ার্ক নেওয়া হয়েছে, মঞ্চে বিশেষ উত্তেজনায়, অস্থিরতা প্রকাশ করতে তা ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা কোনোভাবে আরোপিত লাগে না। তাই নির্দেশিকা কৃতি মজুমদারের নাট্যবোধকে শ্রদ্ধা জানাতেও ইচ্ছা হয়। কারণ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সুছন্দ, সুবিকশিত নাটকের মুহূর্তগুলি প্রচুর অনুশীলন করে নির্মিত হয়েছে, তার ছাপ প্রযোজনায় পড়েছে। অনন্য সহযোগ দানে ধানী মুণ্ডা চরিত্রে প্রশান্ত ভট্টাচার্যের দেহভঙ্গি ও শরীরী অভিনয় সুজন ঘোষের সাথে ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত হতে পারা এই নাটকের বিশেষ সাফল্য। একইভাবে ফাদার, ওঝা এবং বিচারক তিন চরিত্রে পার্থপ্রতিম ঘোষ প্রতিটি চরিত্রকে ওনার এই বয়সে স্বতন্ত্র করে তুলেছেন। মিয়ার্স সাহেব চরিত্রে সম্রাট ঘোষ ভিন্ন ধরনের দেহের ও বাচিক ব্যবহারে নিজের চরিত্রের জেদকে একবগ্গা করে তুলেছেন। শ্রেয়া চ্যাটার্জী অভিনীত ‘শালী’ চরিত্রের উদ্দামতা নাটকের মধ্যে নারী ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। চমকে দিয়েছে সুনাড়া মুণ্ডা চরিত্রে সৃজন ভট্টাচার্যের লাঠিখেলার দক্ষতা এবং উত্তপ্ত অভিনয়। এই নাটকের অন্যতম নরম চরিত্রায়ন ভরত দারোগা। শান্তনু পাল তাই সবার থেকেই আলাদা এবং অনবদ্য নীরব আকুলতা হয়ে এসেছেন এই নাটকে। যথেষ্ট ছোট মানিপহানীর ভূমিকায় এসেছেন কৃতি মজুমদার। এছাড়া, সুগানা মুণ্ডা (বিরসা মুণ্ডার বাবা) / সুদীপ্ত বাসরী, কর্মী (বিরসা মুণ্ডার মা) / কৃষ্ণা সাহা, ব্রাহ্মণ জমিদার / শিলাদিত্য বড়াল, জমিদার গিন্নি / ঋতুপর্ণা মণিগ্রাম, অমূল্য (ডাক্তার) / সৌভিক মাইতি, জেকব (লইয়ার) / মাহিন শেরিফ, পরমী / সৃষ্টি ভট্টাচার্য— সকলেই নিজের সামান্য ভূমিকায় উজ্জ্বল ছিলেন।
মফস্বলি থিয়েটারে এত সুসংবদ্ধ, সুসংগঠিত এবং যুগোপযোগী নাটক কমই আছে। এই নাটকের নির্মাণের পেছনে যে বিস্তৃত গবেষণা ছিল, তার উল্লিখিত তথ্যসূত্রে সংস্থা জানিয়েছে অনেকগুলো গ্রন্থের নাম। যেখানে অনেক গ্রন্থের সাথেই আছে মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’, পবিত্র সরকারের ‘লোকভাষা-সংস্কৃতি ও নন্দনতত্ত্ব’, সুবোধ ঘোষের ‘আদিবাসী সংস্কৃতি’ এবং ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কির লেখা ‘সাঁওতাল গণসংগ্রামের ইতিহাস’ ইত্যাদি বইগুলি। এমন নাট্য নির্মাণের প্রেক্ষাপটের শক্তি হতে পেরেছে জেনে নেবার ইচ্ছা এবং প্রয়োগে সেই মোতাবেক সফলতা। তাই এই প্রযোজনা স্বীকার করিয়ে নিতে পেরেছে যে এটি একটি দায়সারা নাট্য নির্মাণ নয়।
নাটকের পোশাক, সজ্জা, বিন্যাস এবং নির্মাণ প্রধান ছিলেন কৃতি মজুমদার। বীরভূমের ‘আনন’ এবং আগে আননের অভিনেতা উত্তম চট্টোপাধ্যায় সঙ্গীত প্রয়োগ করেছেন। আলোক-চিন্তায় ছিলেন বাবুন চক্রবর্তী। আবহ প্রক্ষেপণ করেছেন শান্তনু পাল। অঙ্গসঞ্চালনা অভিষেক দত্ত, মঞ্চবিন্যাস প্রশান্ত ভট্টাচার্য, মঞ্চোপকরণ সায়নী মাইতি ও তরস্বী পাল মজুমদার, পোশাক রক্ষণাবেক্ষণ শ্রেয়া চ্যাটার্জী, কৃষ্ণা সাহা ও ঋতুপর্ণা মণিগ্রাম এবং পোস্টার নির্মাণ করেছেন সম্রাট ঘোষ। নাটকে লাইভ বাদ্যে হারমোনিয়াম / দিলীপ হালদার, ঢোল-ধামসা বাদ্যে / নারায়ণ চক্রবর্তী এবং বাঁশিতে নির্মাল্য পাল ছিলেন। অন্যান্য সহযোগিতায় ছিলেন অনুজ, বিজয়া, রীণা এবং সোমনাথ পাল। একটি নাটকের আলোচনায় আর কথা বলা যায় না। তাই দলের সম্বন্ধে আরো অনেক জ্ঞাতব্য কথা বলা বাকি থেকে গেল।
তবুও শেষ কথা, ১৯৮৮ সালে ঊষা গাঙ্গুলী নির্মিত রঙ্গকর্মী দলের “লোককথা” প্রযোজনা বার কয়েক দেখেছিলাম। “উলগুলান” নাটক সেই স্মৃতি ফিরিয়ে দিল।
Rabindra Nagar Natyaayudh
Publication Department
3, West Rabindra Nagar
Kolkata, 700065, West Bengal
📞9874053622/9331834142